ছয় দফার পাঁচ দশক : অজয় দাশগুপ্ত

 ————
ঢাকা, ০৭ জুন,  : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। এ বছরের (২০১৬) ২৩ জুন দলটির ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই দলটির মূল অবদান ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার জন্য বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করতে এই দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেছিলেন। চলতি বছরেই ছয় দফা পেশ করার পাঁচ দশক পূর্ণ হচ্ছে (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এ বছরেই আওয়ামী লীগ তাদের ২০তম জাতীয় সম্মেলন করবে ২৮ মার্চ। রাজনৈতিক ঘটনাবলির একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে বলছি- দলটি যদি ছয় দফার ৫০ বছরপূর্তির দিনে তাদের জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করত, সেটা দিবসটির গুরুত্বের সঙ্গে মানানসই হতো। স্কুলে থাকাকালে পরীক্ষায় অনুবাদ করতে বলা হয়েছিল একটি বাক্য- ‘এমন দিন যেন ৪ জুলাই’। দিনটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। তার সঙ্গে তুলনা চলে, এমন ক’টা দিনই বা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। সে কারণেই এমন একটি বাক্য তৈরি হয়েছে এবং অমরত্ব লাভ করেছে। আমাদের এই ভূখ-ে কত দফা ও দাবিনামা কিংবা কর্মসূচি তৈরি হয়েছে; কিন্তু ছয় দফার তুল্য আর কোনো কিছু কি আছে? এই কর্মসূচি পেশের মাত্র পাঁচ বছর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নবযাত্রা শুরু করে। ষাটের দশকে চরম প্রতিকূল পরিবেশে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জনমত সৃষ্টির কাজে অগ্রণী দু’জন জনপ্রিয় ছাত্রলীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদ একাধিকবার উল্লেখ করেছেন- ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ছয় দফা হচ্ছে সাঁকো, এর ওপর দিয়ে স্বাধীনতায় পৌঁছে যেতে হবে।’

ছয় দফা প্রদানের সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বয়স ৪৬ বছর পূর্ণ হতে প্রায় দেড় মাস বাকি। সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। শেখ মুজিবুর রহমান সহকর্মীদের নিয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) পৌঁছেন লাহোরে। সেখানে আইয়ুব খানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। ইস্যু ছিল ১৯৬৫ সালের ‘পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি’। কাশ্মীর নিয়ে ওই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ওই বছরেরই ২ জানুয়ারি আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে ‘পুনর্নির্বাচিত’ হয়েছেন। প্রথমবার ১৯৫৮ সালে সামরিক শক্তিবলে ক্ষমতা দখল করে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন। এ সময়ে রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক নেতাদের জেলে পাঠানো হয়। ষাটের দশকের শুরুতে তিনি পাকিস্তানের জন্য সামরিক ফরমানবলে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন। এর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফের তিনি প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন পূর্ব পাকিস্তানে; ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর যে ভূখ-কে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে। এই নির্বাচনে পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলো আইয়ুব খানকে চ্যালেঞ্জ জানায় পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহকে সামনে রেখে। আইয়ুব খান সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে তার পায়ের নিচে মাটি নেই। বাস্তবে এ মাটি যে ১৯৫২ সালের ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের সময় থেকেই ছিল না!

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া যুদ্ধ চলেছিল ১৭ দিন। পাকিস্তানের জনগণের কাছে প্রচার করা হয়েছিল- যুদ্ধে তারা ভারতকে ‘গো-হারা হারিয়ে দিয়েছে’। এ যুদ্ধ চলতে থাকুক- যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ কয়েকটি ধনী দেশ চায়নি। তাদের সমর্থন নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাসখন্দ শহরে শান্তি আলোচনার আয়োজন করে। স্বাক্ষরিত হয় তাসখন্দ চুক্তি। তখন পাকিস্তানেরই পশ্চিম অংশে প্রশ্ন ওঠে- যুদ্ধে জয় এলো, তাসখন্দ চুক্তি হলো। কিন্তু কাশ্মীর কোথায়? সেটা তো রয়ে গেছে ভারতেই। অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে প্রশ্ন উঠল- আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন এত নাজুক? ভারত তখন পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও গোলাগুলি তো দূরের কথা, একটি ঢিলও নিক্ষেপ করেনি। যুদ্ধের দিনগুলোতে এবং পরের কিছু দিন ‘ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ স্লোগান দিয়ে সর্বত্র মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধের সময় জরুরি আইন ও পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইন জারি করা হয়। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে এসব আইনে গ্রেফতার করা হয়। বিশেষভাবে টার্গেট করা হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের বিভিন্ন অংশের বিশিষ্ট হিন্দুদের। ‘ভারতের আকাশবাণী বেতারের অনুষ্ঠান শুনেছে’- কেবল এ ধরনের ভুয়া অভিযোগের কারণেও অনেকের স্থান হয় কারাগারে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ শুরুর পরপরই আরেকটি কুখ্যাত আইন জারি করা হয়- শত্রু সম্পত্তি আইন। এতে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর সময়ে পাকিস্তানের যেসব নাগরিক ভারতে অবস্থান করছিলেন তাদের নিজ দেশের সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ এবং এ কারণে তা সরকারের হেফাজতে চলে যাবে। একই সঙ্গে বলা হয়, কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তিই এ আইনের আওতায় আসবে। কোনো হিন্দু নাগরিক ওই সময়ে ভারতে ছিল- এমন অভিযোগ করলেও তার জমি, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান সরকারের হাতে চলে গেছে। যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আইয়ুব খানের দল কনভেনশন মুসলিম লীগ এবং গোলাম আযমের দল জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রচারে উন্মাদ হয়ে ওঠে। চারদিকে তখন ভীতিকর অবস্থা। ঠিক এ সময়েই শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থাপন করেন ছয় দফা কর্মসূচি। পাকিস্তানের ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে তাসখন্দ চুক্তিকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এজন্য করণীয় নির্ধারণে তারা লাহোরে বৈঠকও ডেকেছে। কিন্তু বাঙালিদের প্রিয় ও একক নেতা হয়ে ওঠা শেখ মুজিবুর রহমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপস্থাপন করেন ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা’। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ তার বিভিন্ন বক্তৃতায় ‘স্পাইনলেস ইনটেলেকচুয়াল’ শব্দযুগল ব্যবহার করতেন। শাসকদের রক্তচক্ষুর সামনে যারা নত হয়ে থাকতেন, জনগণের স্বার্থের কথা বলতে গেলে যাদের হাঁটু কাঁপত, তাদের সম্পর্কে এ শব্দ দুটি তিনি অনেকবার বলেছেন। ছয় দফার মধ্যে পাকিস্তানের সরকারি দলের নেতারা তো বটেই, বিরোধীরাও দেখতে পান পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত। তাই শেখ মুজিবুর রহমানের এ কর্মসূচি গ্রহণ তো দূরের কথা, সেটা নিয়ে আলোচনা করতেও রাজি হননি। তারা বলেন, বিরোধী নেতাদের সভায় এটা নিয়ে আলোচনা হলে সবাইকে আইয়ুব খান কারাগারে নিক্ষেপ করবেন।

শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা ফিরে আসেন ১১ ফেব্রুয়ারি। এর ১৮ দিনের মাথায় ১ মার্চ (১৯৬৬) তিনি নির্বাচিত হন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন তাজউদ্দীন আহমদ। মিজানুর রহমান চৌধুরী সাংগঠনিক সম্পাদক। আমেনা বেগম সহসাধারণ সম্পাদক। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ সহসভাপতি। সে সময়ে আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান নির্ভর করেন তরুণ প্রজন্মের ওপর। ছাত্রলীগ তার পাশে দাঁড়ায়। শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান প্রমুখ ছয় দফার দাবি নিয়ে কেবল ছাত্রদের কাছে নয়, জনগণের কাছেও চলে যেতে থাকেন। শেখ মুজিব সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন- জেলের বাইরে বেশিদিন থাকতে পারবেন না। তাই জেলায় জেলায় সভা করতে থাকেন। যে জনতা মাত্র চার-পাঁচ মাস আগে ‘ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান জিন্দাবাদ’ এবং ‘ভারতকে নিশ্চিহ্ন কর’ স্লোগানে উচ্চকিত ছিল, তারা দলে দলে ছয় দফার সমর্থনে ডাকা সমাবেশগুলোতে যোগ দিতে থাকে। কয়েকটি জনসভায় বক্তব্যদানের পরপরই শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে জেলা ও মহকুমা আদালতে মামলা হয়। তিনি এক মামলায় জামিন নিয়ে আরেকটি জনসভায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখার পর আবার মামলা। আবার জামিন। কিন্তু ১৯৬৬ সালের ৮ মে তার স্থায়ীভাবে স্থান হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। আইয়ুব খান, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান হুমকি দেন- অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেওয়া হবে। অর্থাৎ ছয় দফার পক্ষে যারা থাকবে, তাদের নির্মূল করা হবে। তাদের এ হুমকি যে কথার কথা ছিল না- তার প্রমাণ মিলেছে ১৯৭১ সালে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের দমিয়ে রাখার জন্যই গড়ে তোলা হয়েছিল।

কী ছিল ছয় দফায়? এতে বলা হয়- রাষ্ট্রপতিশাসিত নয়, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হবে। পার্লামেন্ট সদস্যদের নির্বাচন হতে হবে প্রতিটি নাগরিকের ভোটে; কেবল পাকিস্তানের দুই অংশের ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার বিডি মেম্বারের (এখনকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য) ভোটে নয়। কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন হবে। কেন্দ্রের কাছে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়। পাকিস্তানের উভয় অংশে থাকবে পৃথক মুদ্রা, যা উভয় অংশে অবাধে বিনিময়যোগ্য হবে। প্রদেশের হাতে থাকবে কর আরোপের ক্ষমতা। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের দাবি করেন।

পাকিস্তানের পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল এক হাজার মাইলের বেশি- মাঝের স্থলভাগে ভারত, যাকে পাকিস্তানের শাসকরা গণ্য করত শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে। বাঙালিরা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু বিপুলভাবে বঞ্চিত। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান প্রমুখ তরুণ অর্থনীতিবিদ ষাটের দশকের শুরু থেকেই ‘দুই অর্থনীতির তত্ত্ব’ সামনে আনতে থাকেন। এ কারণে একটি ধারণাও জনমনে গড়ে ওঠে- এসব অর্থনীতিবিদই ছয় দফা কর্মসূচি তৈরি করে তা শেখ মুজিবকে দেন। কারণ এ নিয়ে লড়তে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। কিন্তু রেহমান সোবহান তার Untranquil Recollections : The Year of Fulfilment গ্রন্থে লিখেছেন, ছয় দফা হয়ে ওঠে সেল্ফ রুলের জন্য বাঙালিদের সংগ্রামের ম্যাগনাকার্টা। এর বেশিরভাগ দাবি ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। চারটি দাবি মূলত অর্থনৈতিক। পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন অর্থনীতিবিদ পাকিস্তানের বঞ্চনার বিরুদ্ধে এসব ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন। রেহমান সোবহান লিখেছেন, ছয় দফার প্রণেতা বা অথরশিপ হিসেবে যে কৃতিত্ব কেউ কেউ তাকে দিয়ে দেন, সেটা আদৌ সত্য নয়। তবে ‘অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, হাবিবুর রহমান, আখলাকুর রহমান, আনিসুর রহমান প্রমুখ অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমি এ দলিলের ইনটেলেকচুয়াল সোর্স হিসেবে অবদান রেখেছি।’

শেখ মুজিবুর রহমানসহ দলের নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ প্রদেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে, যাতে সাড়া মেলে ব্যাপক। শ্রমিকরা পথে নেমে আসে। সরকারের প্রচ- দমননীতির কারণে এর পরের দেড়টি বছর ‘পূর্ব পাকিস্তান ছিল চুপচাপ’। ফের জেগে ওঠে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে। ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় লাখ লাখ ছাত্র-জনতা, শ্রমিক এবং সরকারি অফিসার ও কর্মী রাজপথে নেমে এসে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে। এ সময়ে ডাকসু এবং ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করে ১১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ১১ দফায় ছয় দফার প্রতিটি দাবি স্থান পায়। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বিপুল সংখ্যক রাজবন্দি মুক্ত হয়ে জনতার কাতারে শামিল হন। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাহার করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলায় গিয়ে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা’ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তিনি জনগণের কাছে বরণীয় হন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার সমর্থনে ভোট চান। তিনি বলেন- ‘এ নির্বাচন ছয় দফার ইস্যুতে গণভোট’। জনগণ তারই স্বীকৃতি দেয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের জয়ী করে।

ছয় দফা কর্মসূচি একটি জাতির জন্মের কারণ হয়ে উঠতে পেরেছিল। এ কর্মসূচিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দাবি সন্নিবেশিত হয়। শেখ মুজিব লাহোরে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে ঢাকায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা’ পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। এটা রচনা করা হয় আমজনতার ভাষায়। মুদ্রানীতি, শুল্ক ও কর, বৈদেশিক বাণিজ্য- এসব অর্থনীতির জটিল বিষয় কীভাবে তিনি স্বল্পশিক্ষিত কিংবা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষের কাছে বোধগম্য করে তুলতে পেরেছিলেন, সেটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য এখনও ধাঁধা। এত দ্রুত কীভাবে তা জনসমর্থন সংগঠিত করতে পেরেছিল, যখন শত শত রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা জেলে? ছয় দফা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো স্পষ্ট হয়ে যায়- এ দাবি মেনে নেওয়া হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের শাসকরা ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর দাবি মানতে চাননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অনন্যসাধারণ দৃঢ়তা দেখানথ ছয় দফা, না হয় এক দফা অর্থাৎ স্বাধীনতা। তিনি তার অঙ্গীকার রক্ষা করেন। কৃতজ্ঞ জনগণ ছয় দফা ঘোষণার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই তাকে অধিষ্ঠিত করে বাংলাদেশের জাতির পিতার মর্যাদায়। পাকিস্তানের শাসকরা অস্ত্রের ভাষায় জবাব দিয়েছিল ছয় দফার, যার অঙ্গীকার তারা করেছিল ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ছয় দফা ঘোষণার পরপরই।

এ কর্মসূচি এবং তা ঘোষণার দিনটি কেবল আওয়ামী লীগের হবে কেন- সে প্রশ্ন সঙ্গত। দিনটি ধানম-ির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মতো নিছক আনুষ্ঠানিকতা হবে না- সেটাও প্রত্যাশিত।

প্রবন্ধকার : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট


এ বিভাগের আরো খবর...
আজকের রাশিফল, ২৪ জুন, ২০১৬, শুক্রবার আজকের রাশিফল, ২৪ জুন, ২০১৬, শুক্রবার
হজ ফ্লাইট শুরু ৪ আগস্ট হজ ফ্লাইট শুরু ৪ আগস্ট
এবার ঝিনাইদহে পুরোহিতকে গলাকেটে হত্যা এবার ঝিনাইদহে পুরোহিতকে গলাকেটে হত্যা
৬টি দফার বাঁধনেই বাংলাদেশ ৬টি দফার বাঁধনেই বাংলাদেশ
এ এক অন্য জয়া! এ এক অন্য জয়া!
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের কাজে হতাশ উচ্চ আদালত! ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের কাজে হতাশ উচ্চ আদালত!
প্রথম রমজানে এতিমদের সঙ্গে ইফতার করবেন খালেদা প্রথম রমজানে এতিমদের সঙ্গে ইফতার করবেন খালেদা
দেশের আকাশে রমজানের চাঁদ, মঙ্গলবার থেকে রোজা দেশের আকাশে রমজানের চাঁদ, মঙ্গলবার থেকে রোজা
মা হতে অনিচ্ছুক নারীরা ‘অসম্পূর্ণ’: এরদোয়ান মা হতে অনিচ্ছুক নারীরা ‘অসম্পূর্ণ’: এরদোয়ান

ছয় দফার পাঁচ দশক : অজয় দাশগুপ্ত
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)